শিখা । পর্ব ২ । মাহাদী হাসান

উচ্চ মাধ্যমিকে কোন কলেজে ভর্তি হব যখন ভাবছি তখন একটা ফোনকল এলো।
ওপাশ থেকে আমাকে অভিনন্দন জানিয়ে বলল আমি নাকি একটি কুইজ প্রতিযোগিতায় বিজয়ী নির্বাচিত হয়েছি ।
এমনভাবে বলল যেনো প্রথম পুরষ্কারটা আমাকেই দিবে আর কেউই পাবে না।
আমিতো আনন্দে আটখানা জীবনে কোনোদিন কোথাও বিজয়ী হইনি এবার বুঝি সবকিছুর শোধ একটা ল্যাপটপ দিয়েই হবে।
আমি শখের বশে ছবি আঁকলেও কেন যেনো কাউকে দেখাতে ইচ্ছা করতোনা
প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ ?
সেটাতো গ্রামে হতই না।
মাঝে মাঝে স্কুল পরিদর্শনে আসা সারেরা ছবি আঁকতে সবাইকে উৎসাহিত করে আঁকতে বললে সবার সাথে আমিও আঁকতাম
সবাই দেখি আমার ছবি আঁকার খুবই তারিফ করে
তাই আমি আমার আঁকা ছবি গুলো খুব ভালো করে খুঁটিয়ে দেখতাম কি এমন আশ্চার্য চমৎকার কঠিন জিনিস আমি আঁকলাম ?
 আমার কাছেও তাদের ছবি আঁকাটা আশ্চার্য লাগে এদের ছবি কেন আমার মত হয় না ?
ওরা কেনো পারেনা ?
ছবি আঁকাটা আমার কাছে খুবই সজা মনে হলেও
ছবি আঁকায় বিশেষজ্ঞদের কথা ভুল প্রমানিত করল আমার হাতের লিখা
আমার হাতের লিখা দেখলে মনে হবে একটা পিপীলিকাকে কালিতে চুবিয়ে আমার খাতার উপর সোজা বরাবর লাইন করে জমিতে গরু দিয়ে লাঙ্গল চাষ করানোর মত হাহঃ হুররর বলে বলে হাটিয়েছে
তবুও শহর থেকে বেড়াতে আসা খালতো ভাই বোনরা এসে যখন আমার ছবি আঁকা দেখতে চায় আমি সেটা খুবই উপভোগ করি। তারা আমার ছবি আঁকা ও আঁকা ছবি গুলো খুবই মনোযোগ দিয়ে দেখে বলে আমি ছবি আঁকায় প্রচুর উৎসাহ পাই।
একবার তো বছর শেষে স্কুল ছুটিতে শহরে বেড়াতে গিয়ে কয়েকটা চিত্রাংকন প্রতিযোগিতাও দিয়েছি। কোথাও কোনো সাড়া জাগানো বা বলার মত কোনো ফলাফল পাইনি।
কয়েকজন বন্ধু আমার আঁকা তার পছন্দের ছবি টাকা দিয়েও আঁকিয়ে নিয়েছে।
আবার অনেকে আমার সুন্দর ছবি গুলো আবদার করে নিয়ে গেছে।
তাদের থেকে পরবর্তীতে ছবিগুলো কি করেছে জানতে চাইলে আমার পছন্দের উত্তর দিতে পারতোনা।
কেউ বলতো আরেকজন নিয়ে গেছে।
আবার কেউ বলতো কই রেখেছি কি করেছি ভুলে গেছি।
একবার আমার এক প্রিয় শিক্ষক আমার আঁকা ছবি তার মেয়েকে দিবে বলে আবদার করায় কয়েকটা ছবি উপহার দিলাম।
সারকেও একদিন জিজ্ঞেস করেছি ছবি গুলো কি করেছে ?
সার বলল ছবি গুলো কোচিং এ রেখেছে তারপর কোচিং থেকে বাসায় নেয়নি কোচিংয়ের কোথায় আছে বলতেও পারবেনা।
তারপর কোচিং এর ভাইয়াদের বলে সব জায়গা খুঁজে অবশেষে বাথরুমের ছাদের ক্যাবিনেটে পেয়েছি।
বাসায় এনে দেখি ছবির সবচেয়ে আকর্ষণীয় জায়গাগুলো পানি লেগে ছিদ্র হয়ে গেছে না হয় রং উঠে গেছে।
এজন্য কোনো ছবি আঁকার প্রতিযোগিতায় আর যাই না কাউকে আঁকা ছবি দেইও না।
মন ভালো করার জন্য আঁকা ছবি গুলো নিজের কাছেই রেখে দেই।
আমার এক দাদাকে দেখেছি পেশায় রিকশা চালক হলেও প্রবীণ বয়সেও তার ঘুড়ি বানানোর হাত ছিল পাকা।
প্রতিবছর দূর দূরান্ত থেকে তার ভক্তরা আসতো তার ঘুড়ির যাদু দেখতে।
আমিও সে দাদুর খুব ভক্ত ছিলাম কিন্তু দাদুকে খুব কম বাড়িতে দেখতে পেতাম।
উনি নিজ এলাকায় খুব কম রিকশা চালাতো।
রাত করে বাসায় ফিরত।
যখন পরিবারে ওনার রোজগারের প্রয়োজন হতনা তখনও তিনি রিকশা চালাতেন।
আমি এখনও দাদুকে অনেক মিস করি।
উনি যখনই পরিবারের চাপে রিকশা চালানো বন্ধ করে দিয়েছেন তখনি তার শরীরে রোগ বাসা বাধতে শুরু করেছিল
মাঝে মাঝে উনি বিষয়টা বুঝতে পেরে অসহ্য হয়ে আবার রিকশা চালাতে চলে যেতেন কিন্তু একবার নিয়মিত রিকশা চালানো বন্ধ করায় উনি যে রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন আবার রিকশা চালানো শুরু করায় তা আরো মারাত্মক আকার ধারন করে তার অকাল মৃত্যুর কারন হয়ছিল
আমাদের পরিবারের সাথে ওই দাদুদের পরিবারের ভালো সম্পর্ক ছিলনা তাই মাঝে মাঝে আমরা তাদের সাথে ঝগড়া করতাম।
এরকম আমাদের এলাকার আরও কয়েকজন ছিলেন যারা প্রবীণ বয়সেও তার খুব শক্তি প্রদর্শন করেছিলে। শেষ কয়েক বছর তারা খুবই কষ্টে অন্যদের ভরসায় বেঁচেছিলেন।
তাদের দেখে প্রভুর কাছে একটাই চাইতে ইচ্ছা করে তিনি যেনো এরকম অবস্থায় আমার না করেন।
এজন্য আমি একটা জিনিস খুব ভালো ভাবে মেনে চলার চেষ্টা করি,
সেটা হল
আমি সর্বদা নিজেকে সংশোধন করার চেষ্টায় থাকি, নিজে ভালো হয়ে চলার চেষ্টা করি।
কারন ভালো মানুষের জন্য সকল প্রাণীজগৎ দোয়া করে।
যেমন আমরা নামাযে তাসাহুদে বলে থাকি
আসসালামুয়ালাইকা অয়ালা ইবাদিল্লাহিস সলিহিন
মানে হল
“আমি সকল ভালো কাজকরা লোকদের শান্তি কামনা করি”
       
দলবদ্ধ খেলাধুলা বেশিদিন আমাকে জড়াতে পারেনি।
কারন আমি ছোট বেলা থেকেই মুখচোরা, ভালো করে কারও সাথে কথা বলিনা।
যাকে ভালো লাগে তার সাথে আবার অনেক কথা বলি যেগুলো অন্য কেউ রিমান্ডে নিয়েও বের করতে পারবেনা।
এজন্য নিজে নিজে খেলতেই অনেক ভালো লাগে।
আমি মাটি বা বালু দিয়ে যা মন চায় বানিয়ে ফেলি।
মাঝে মাঝে সাগরপাড়ে বাচ্চাদের মত বালি নিয়ে খেলাধুলা শুরু করে দেই।
জীবনে যা মন ছেয়েছে, যা করতে ছেয়েছি প্রভু আমাকে সব সুযোগ করে দিয়েছে।
প্রভু যেনো তার কৃতজ্ঞতা আদায় করার সুযোগটাও দেয়।
এজন্যই মনে হল এবার বুঝি সববিজয়ের শোধ একটা ল্যাপটপ দিয়েই হবে।
তাই খুশির ঠ্যালায় ঢাকা থেকে চিটাগাং চলে গেলাম।
যখন পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে গেলাম হাজারও আমার মত উচ্চ মাধ্যমিকে ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থী দেখে বুঝতে পারলামনা এরা কোথা থেকে কিভাবে এসেছে।
আরেকবার নিশ্চিত হয়ে নিলাম আমিকি সঠিক জায়গায় এসেছি কিনা ?
আমার কছাকাছি বসা কয়কজন কে জিজ্ঞেস করলাম তারা কিভাবে এসেছে ওরা বলল এখানে সবাই কুইজে অংশ নিয়ে এখানে এসেছে।
এবার বুঝলাম আমি আসলে মুলা দেখে এখানে পয়সা খরচ করে এসেছি।
কুইজে যারা বিজয়ী হয়েছে তাদের নাম, আর মোবাইল নম্বর লিখা কাগজ দিয়ে লটারি হবে সেখান থেকে মুলার বিজয়ী নির্ধারণ হবে মানে তারা ল্যাপটপ, ট্যাব, মোবাইল এগুলো পাবে।
কি আর করার তবুও যাতে চলে না যাই সেজন্যও লোভনীয় আয়োজন রেখেছে,
চট্টগ্রামের সবচেয়ে জনপ্রিয় বস শিক্ষকদের একজন যার ক্লাস আমিও করে ভক্ত হয়ে গিয়েছি সে সার যখন উপস্থাপক বা সঞ্চালক তখন শিক্ষার্থীরা মন্ত্রমুগ্ধের মত তার কথার জালে ২-৩ কাটিয়ে দিল।
আমি একটা প্রশ্ন করায় আমাকে বড় পর্দায় দেখা যাওয়ায় সেখানে উপস্থিত থাকা আমার এক বন্ধু আমাকে খুঁজে বের করে আমার কাছে চলে এলো। ও নানান কেরামতি দেখিয়ে আমাকে বিনোদণ দিলো নিজেও মজা করল।
তার মধ্যে একটা হল ও রাস্তার মাঝে গিয়ে নাচানাচি আরম্ভ করে দিলো, গাড়ির সামনে দিয়ে পার হয়ে আবার দৌড়ে পিছিয়ে আসে এতে গাড়িয়াল ভাইয়েরা নাস্তানাবুদ হল।
আমি জিবনেও জিইসির মত ব্যস্ততম রাস্তায় এরকম মারাত্মক বিনোদন করতে পারবনা।
এরকম সিরিয়াস ফাইজলামি টিভিতে মিস্টার বিন বেটাই করে বাস্তবে এরকম নাটক ওই আমাকে দেখাল
এজন্যই সে এখন মঞ্চনাটকের মঞ্চকাঁপিয়ে একটা পাইভেট চ্যানেলেও সংবাদ উপস্থাপনা করতে দেখেছি
আমি তার সার্বিক সাফল্য কামনা করি
আমার কাছে এধরনের নাটকীয়তা দুঃস্বপ্ন মনে হয়
মেসেঞ্জারে একটা বন্ধু মেসেজ দিলো কেমন আছিস?
এই বেটা প্রায়ই মিষ্টি কথায় ভুলিয়ে টাকা ধার চায়
আমি এপর্যন্ত টাকা ধার দিয়ে কারো সাথে ভালো ভালোয় টাকা পাইনি।
কেউ ঘুরিয়ে ফিরিয়ে নাস্তানাবুদ করে দিয়েছে আবার কেউ, না দেয়ার মত দিয়েছে, আবার কেউ অন্য কিছু দিয়ে ফাঁসিয়ে দিয়েছে।
একবার শরিয়ত সম্মত ভাবে টাকা ধার দিয়ে বহুত কষ্টে ফেরত পেয়েছি তাও ১০% এর মত লোকসান হয়ছে।
আমি এবার ধরেছি বিরাট প্যাঁচ
আমি আজ কলেজে ঘোড়ায় চলে গিয়েছিলাম শুনে ও আমাকে জিজ্ঞাস করল
>>> কিরে ঘোড়া পেলি কই ? আমাদের কলেজের রাস্তায় তো পুরান ঢাকার মত ঘোড়ার গাড়িও চলেনা তুই কার ঘোড়ায় চড়ে কলেজে গেলি?
>> আমার ঘোড়ায়
>>> তুই ঘোড়া পাইলি কই ?
>> আরে আমি মোটর সাইকেলে যেতে ভয় পাই। তাছাড়া আমার রাকিব নামের অর্থ সাহসী অর্শযোদ্ধা। জানিনা আমার রোমান্টিক মামা কি মনে করে কোত্থেকে এই ঘোড়া এনেছে জানিনা। আমিও ঘোড়া পেয়ে ভীষণ খুশি। তাই আজই ঘোড়া নিয়া কলেজে চললাম।
>>> কস কি বেটা ? হাহাহা,  তুই ঘোড়া রাখলি কই ?
>> সার মেডামরা যেখানে গাড়ি রাখে ওখানে গাছের সাথে বেঁধে রাখসি
>>> পারলে কিছু টাকা ধার দে।
>> আচ্ছা তাহলে কাল বিকালে ঘোড়া নিয়ে দিয়া বাড়ি যাব তুই সাথে যাইস টাকাও নিস একটু মজাও নিস।
>>> তর কাছে সত্যি ঘোড়া আছে ?
>> বেটা  আমি তর সাথে এতক্ষন ফাইজলামি করসি মনে করসস ?
>>> না বন্ধু, তুই তো মিছা কথা কস না। তারপর ও বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়রে ।
>> বেটা তাইলে কাল আইসা নিজে দেইখা যাইস।
>>> আচ্ছা বন্ধু তুই ঘোড়াটারে কি খাওয়াস ?
>> কি খাওয়ামু ? ছোলা কিনে আনসি আর ভুষি তুসি হাবিজাবি মামা রেখে গেসে ওগুলোই পালাকরে খাওয়াই আর বাসা পিছে একটা খালি মাঠের মত আছে একটা রিয়েল স্টেট কোম্পানির ওখানকার দারোয়ান চাচাকে বলে ওখানের ঘাস খাওয়াই। এভাবে খাওয়াইলে ঘাসগুলো তাড়াতাড়ি শেষ হই যাবে আর নতুন ঘাস উঠতেও একটু সময় লাগে তাই ভাবসি অবসর সময়ে ঘোড়াটাকে অন্য জায়গা থেকে ঘাস খাওয়াই আনব। কি বলস ?
>>> হ, ভালো বুদ্ধি, তুইও একটু অনলাইনের বাহিরে সময় কাটাতে পারবি।
>> হুম্ম। সেটাই । মামার বুদ্ধি কিন্তু প্রচুর।
>>> হ ভাই, তর মামার সেই বুদ্ধি
>> হ ব্যাটা, আমার এই মামা সবার প্রিয়। এমন একজন যে সবার মন জয় করতে পারে। সে এমন কাজ করবে যাতে কেউ রাগতো হয়ই না বরং অনেক খুশি। মামার নামও অনেক সুন্দর আসল নাম সিদ্দিক আহমদ হলেও ডাক নাক কাকন।
আমরা কাকন মামা ডাকি।
>>> ও আচ্ছা, তুই ঘোড়ায় ছড়তে পারস ? একা উঠতে ভয় করেনা ?
>> আরে না ভয় কিসের ? আমারত ঘোড়ায় ছড়তে সেই মজা লাগে। আরে আমার তো এখন প্রতিদিন কলেজ যেতে ইচ্ছা করে ঘোড়া হওয়ায় সুবিধা আরও বেশি।
>>> যেমন ?
>> এই ধর রাস্তায় প্রচুর জেম ঘোড়া হওয়ায় সহজেই ফাক গলে ভিড় ঠেলে পার হই যাওয়া যায়। আর টঙ্গী বাজার থেকে কলেজ পর্যন্ত দেখস তো যেই রাস্তা । পুরো রাস্তার পাশে কত গুলো কাভার্ড ভ্যান, লরি, ট্র্যাক রাখা এর মাঝে ভাঙা রাস্তার কারনে এত জ্যাম বাধে যে কলেজে যাওয়ার ইচ্ছা একদমি করেনা। প্রতিদিন দেরি হয়। ঘোড়া তো রাস্তার পাশ দিয়ে চলে যায়, তাই সময় ও কম লাগে।
>>> কেন তর গায়ে কাঁদার ছিটকা পরেনা ?
>> কই লাগে নাই তো, আরে এতা তো গরু না যে ছিটকা লাগবে।
>>> ও আচ্ছা আসলেই তো তর মামা জোশ !!!
>> বন্ধু তাহলে কাল তর সাথে কলেজে যাবো।
>>> আচ্ছা ঠিক আছে
  
 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

0
    0
    Your Cart
    Your cart is emptyReturn to Shop